কারবালার ইতিহাস

কারবালার ঘটনা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারবালার মাঠে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের মৃত্যুর মাত্র 50 বছর পরে মাত্র। সেই মুসলমানদেরই তার উম্মতেরই কিছু মানুষ তার প্রিয়তম নাতি তার কলিজার টুকরা নাতি হোসাইন ইবনে আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা এবং তার বংশের নিষ্পাপ নিরীহ অসহায় অনেকগুলো মানুষকে হত্যা করে। বিষয়টা খুবই জটিল। যে রাসূলুল্লাহ সাল্লামের প্রিয়তম নাতি তারই উম্মতের হাতে শহীদ হয়ে যাচ্ছেন। এটা কষ্টের ব্যাপার। বেদনার ব্যাপার। এবং এই হত্যাকাণ্ডের ভিতর দিয়ে উম্মতের ভিতরে চিরস্থায়ী বিভক্তি, মারামারি, ফেতনা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও কবির কবিতায় বলে ইসলাম জিন্দা হতাহে কি যেন হার কারবালা কে বাদমে কারবালার পরে ইসলাম জিন্দা হয়। তবে ইতিহাস বলে কারবালার পরে ইসলাম জিন্দা হয়নি। কারবালার ঘটনা বেদনা ব্যথা কষ্ট দুঃখ বিভক্তি দিয়েছে, কারবালার ঘটনায় যারা হত্যার কাজে শরিক হয়েছে সবাই নিহত হয়েছে, অপমৃত্যু হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে। সবই ঠিক আছে কিন্তু ইসলাম জিন্দা হয়েছে এরকম ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তো যাই হোক আমরা কারবালার ঘটনা এবং এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় সুন্নতের আলোকে কি হওয়া উচিত সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। মূল বিষয় হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম মানবতার জন্য একটা নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা আনলেন, যেটা বিশ্বে ছিল না। আরব দেশে তো ছিল নাই। আরব দেশের মানুষ ছিল কবিলাতান্ত্রিক, গোত্রভিত্তিক । সিরিয়ার পাশে এবং পারস্যের পাশে ছোট রাষ্ট্র ছিল। রাষ্ট্র মানে একজন রাষ্ট্রপ্রধান তার হাতে বাহিনী, বিচারাচার। জনগণ যে যে গোষ্ঠীর হোক আর যে দলের হোক রাষ্ট্রের আইন মেনে চলতে হবে। আর আরব দেশে রাষ্ট্র বলে কিছু ছিল না। সমাজ ছিল আর গোত্র। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কবিলা। মন্ডল গোষ্ঠী মন্ডলদের হেড। সে বললে অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে যাবে। সে বললে দাঁড়িয়ে যাবে। সে বললে লড়াই করবে। প্রত্যেক গোত্রের মানুষ তাদের গোত্রের প্রধানের নির্দেশে চলতেন। গোত্র হল রাষ্ট্র। যুদ্ধ হবে গোত্রের প্রধান বললে হবে। ওই সময়ে বিশ্বে রাষ্ট্র ছিল। আরবের বাইরে, মিশরে, সিরিয়ায়, পারস্যে, ইউরোপে, ভারতে, চীনে সব জায়গায় রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল। তবে গোত্র এবং রাষ্ট্রের একটা মিল ছিল। গোত্র ব্যবস্থা রক্তের উপরে ভিত্তি। একজন মারা গেলে তার ভাই অথবা ছেলে গোত্রের প্রধান হতো। আরেকজন মারা গেল তার ভাই ছেলে ভাতিজা গোত্রের প্রধান হবে। রক্ত বংশ এখানে মেইন। আবার যে রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু ছিল বিশ্বে সেটাও ছিল রক্ত বংশতান্ত্রিক। রাজা মরে গেলে রাজার ছেলে, ভাই, বউ কেউ না কেউ রাজা হবে। বাইরের কেউ না আপনারা শুনেছেন ডেমোক্রেসি বলে একটা শব্দ আছে আমরা বাংলায় বলি গণতন্ত্র এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগেই কয়েকশ বছর আগে গ্রিসে জন্ম নিছিল এবং সেখানেই মারা গিয়েছিল। গণতন্ত্র হল জনগণের পরামর্শই দেশ চলবে সরাসরি বা পরোক্ষ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে সারা বিশ্বে রাষ্ট্রব্যবস্থাও ছিল বংশতান্ত্রিক আর আরব দেশের সমাজ ব্যবস্থা ছিল কবিলাতান্ত্রিক। বংশতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আরেকটা বিষয় ছিল রাজা মানে মালিক আর জনগণ হল প্রজা। প্রজা হল মালিকের অধীন, রাজা যেটা বলবে মেনে নিতে হবে। যদি বলে এখান থেকে বাড়ি সরাও ওখানে যাও যেতে হবে। যদি বলে বাঁচো বাঁচো মরো মরো। এখানে রাজ্য কি করে চলবে জনগণের কোন ইচ্ছা আছে বিষয় না। রাজা যেটা বলবে সেইটা। এটাকে বলা হয় স্বৈরতন্ত্র, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরব দেশে আসলেন। তিনি দ্বীনের পাশাপাশি একটা রাষ্ট্র দিয়ে গেলেন। সেই রাষ্ট্রটা আবার দিলেন সম্পূর্ণ অভিনব নতুন রাষ্ট্র, বংশতান্ত্রিক নয়, যোগ্যতাভিত্তিক। যে কোন যোগ্য মানুষ রাষ্ট্রের প্রধান হয়ে যেতে পারে। যদি একজন কালো, নাকবোচা, কানবেকা কৃতদাস; সেও যদি তোমাদের আমির হয়,শাসক হয়, প্রশাসক হয় তার আনুগত্য করতে হবে। দ্বিতীয় বিষয় এখানে জনগণের পরামর্শ নিয়ে চলতে হবে। আমরু মসূরা বাইনাহুম প্রতিটি কাজ আমানত আদায় করতে হবে। ইনসাফ আদালত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণ ইচ্ছা করলেই শাসকের সমালোচনা করতে পারবে। তার সামনে আইন পেশ করতে পারবে, যে এটা ঠিক হয়নি। এই যে সিস্টেম এটা অভিনব ছিল। আরবরা তো দেখিনি, দুনিয়ার মানুষও ওই সময় দেখে নাই। এখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যখন মৃত্যুর সময় আসলো সাধারণ মানুষ সবাই আশা করছে তিনি কাউকে গদ্দিনশীল করে যাবেন। কারণ আইন কানুন যাই দেয়া হোক নিয়ম হলো কেউ মরার সময় কাউকে না কাউকে বলে যাবে, আমার পরে তোমরা এর দেখবা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা যদি বলতেন তাহলে সহজ হতো মানুষের জন্য। কিন্তু এই যে নতুন সিস্টেম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিলেন এটা প্র্যাক্টিক্যাল হতো না। যেমন আপনি সাতার শেখাবেন হাত ধরে রেখেছেন প্র্যাক্টিক্যাল হলো না। হাত ছেড়ে ধাক্কা মেরে পানিতে দিলেন পাচ গাল ঢকঢক করে পানি খাবে, পেট একটু ফলবে সাতার শিখে যাবে। এখন রাসূলাম কাউকে দায়িত্ব দিয়ে গেলেন না। তখন সাহাবীদের ভিতরে দুটো ধারা ছিল। অনেক সাহাবী মনে করতেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাই বলেন যুগ যুগ ধরে তো বংশতন্ত্রই চলছে। আমাদের দেশে কোন পীর সাহেব যদি মরে যান দারগদ্দিন কে হয়? যদি অন্য কেউ হয় মুরিদরা মানতে চায় না। এটা আমরা পীর সাহেবরা পীর দরবারের লোকেরা করতাম। এখন রাজনীতিবিদরা কি করেন? এখন রাজনীতিতেও বংশতন্ত্র। কেন? কারণ মানে আমরা মানসিকতায় ওরকম রয়ে গেছি। যদিও বলছি গণতন্ত্র। কিন্তু বংশের একজন মানুষকে যত কদর করি অন্য বংশের মানুষের ওরকম কদর করতে পারছি না। এজন্য নেতার বংশের যদি কেউ আসে যত সহজে দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। বাইরের কেউ গেলে ওরকম হয় না। এটা আমরা আমাদের দেশেও জানি। আরব দেশে আরো কঠিন। অনেকেই মনে করছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়তম সাহাবী আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে হয়তো দায়িত্ব দেবেন। কারণ সবসময় তিনি তার পাশে আছেন। কেউ কেউ মনে করছিলেন হয়তো তিনি তার বংশের কাউকে দেবেন। কারণ যুগ যুগ ধরে তো বংশতান্ত্রিক হয়েই আসছে। তার বংশে তো যোগ্য লোক আছে তিনি দিতে পারেন। রাসূলুল্লাহ (সা) কাউকে দেননি। তার অফাতের পরে সাহাবীরা দ্বিধাদ্বন্দ কে হবে? আনসারীরা বলেন আমরা মুহাজিররা বলেন আমরা। বংশের লোকেরা কেউ কেউ বলছিলেন আমাদের থেকেও হবে। শেষ পর্যন্ত নানান রকমের কথাবার্তার মাধ্যমে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তালা আনহু খলিফা হলেন। এরপরে ওমর হলেন। এরপর ওসমান হলেন। সবসময় কিছু মানুষ মনে করছিল রাসূলামের বংশের কেউ হতে পারে, যোগ্যতা আছে। আবার অনেকেই মনে করছিল যে না সাহাবীরা আরো আছেন তারাও যোগ্য। সর্বশেষ যে নির্বাচনটা হলো ওসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সময়ে হলো ওমর রাদিয়াল্লাহু তালা আনহুর ওফাতের পরে। ওমর বললেন তোমাদেরকে রেখে গেলাম আব্দুর রহমান আউফ, ওসমান, আলী, তালহা, জুবাইর আর সাদ ইবনে আব ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু তালা আনহু আজমাইন এনাদেরকে নিয়ে একটা কমিটি করে দিলেন। তোমরা কমিটি পরামর্শ করে তোমাদের ভিতর থেকে একজন হবে। কমিটিতে বসে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ বললেন যে আমি হব না। আমি আমার মনোনয়ন প্রত্যাহার করলাম। এখন আপনারা বাকিরা যদি চান তাহলে আপনাদের ভিতর থেকে কাকে করব? আমি জনগণের সাথে পরামর্শ করে দিতে পারি। তারা বলল ঠিক আছে আপনি পরামর্শ করে দেন। তিনদিন তিন রাত তিনি পরামর্শ করলেন এরপরে মসজিদে নববীতে ফজরের নামাজের পরে তিনি আলী রাদিয়াল্লাহু তালা আনহুকে বললেন যে আলী কিছু মনে করেন না জনগণের পরামর্শ ওসমানের দিকে যাচ্ছে এজন্য আমরা আসেন সবাই ওসমানের হাতে বায়াত করি। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এরপরে সবাই বায়াত করলেন। এই যে ধারা জনগণতান্ত্রিক, পরামর্শতান্ত্রিক কাউকে কেউ খলিফা গদ্দনশীন করে যাচ্ছে না। এটা একটা অভিনব বিষয় হওয়ার কারণে এটাকে মেনে নিতে উম্মতকে অনেক কষ্ট করতে হলো। এটা ঘটলো ওসমান রাদিয়াল্লাহু তালা ওফাতের পরে। তিনি শহীদ হলেন। মদিনার লোকেরা আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা খলিফা বানালো। সিরিয়াতে মুয়াবিয়া (রা) বললেন যে ওসমানের হত্যার বিচার না হলে আমি মেনে নেব না। এই বিচার অবিচার বিচার বিচার এটা নিয়ে আলী বললেন সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন। এখনো বিদ্রোহীরা সেনাবাহিনীতে রয়েছে। তারা সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা যদি বিভক্ত থাকি আমি বিচার করতে পারবো না। আসেন ঐক্যবদ্ধ হই। এরপরে আমরা অবশ্যই বিচার করব। এই নিয়ে বিতর্ক হতে হতে যুদ্ধ হলো। আলী রা শহীদ হয়ে গেলেন এক পর্যায়ে। হাসান রা: কে কুফার লোকেরা খলিফা বানালো। ওদিকে মুয়াবিয়া রাদি খেলাফতের ঘোষণা দিলেন। দুই দলে যুদ্ধ হবে। হাসান রা: নিজে বলেন যে না আমি আমার নানার উম্মতে যুদ্ধ করাবো না। তিনি মুয়াবিয়া রা: কে ছেড়ে দিলেন। এই হলো তৎকালীন প্রেক্ষাপট। মুয়াবিয়া রা: 20 বছর খুব সুন্দরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। একদম টনটনে আইন শৃঙ্খলা নিরাপত্তা শান্তি অন্য দেশের সাথে সন্ধি, যুদ্ধ, বিজয় খুব ভালো চলে। শেষ জীবনে অনেকেই তাকে পরামর্শ দিল যে ওমরের পর থেকে মুসলিম রাষ্ট্রটা যেভাবে দুর্বল হয়ে গেছিল ওসমান এবং আলী রা: সময়, আপনার সময় খুব শক্তিশালী হয়েছে। আপনি একজনকে গদ্দিনশীন করে যান। তিনি বিষয়টাকে ভালো মনে করলেন। উম্মতের জন্য দ্বীনের জন্য রাষ্ট্রের জন্য কাকে করা যায়? আপনার ছেলে এজিদকে করেন। আপনারা তো মনে করেন যে এজিদের পক্ষে বোধহয় কেউ ছিল না। আমরা মনে করি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বতে এজিদের পক্ষে কেউ ছিল না। অধিকাংশ এলাকায় এজিদের পক্ষে ছিল। আরব কবিলাগুলো বিশেষ করে মক্কা শরীফ, মদিনা শরীফ, কুফা বাদ দিলে অধিকাংশই এলাকার মানুষ ভাবলেন, এটা হলে খুব ভালো হয়। দেশের আইন-শৃঙ্খলা ভালো থাকবে। কিন্তু মক্কা শরীফ, মদিনা শরীফে পুরনো সাহাবীরা তখনো বেঁচে আছেন। অনেকেই তারা এটা পছন্দ করলেন না। অনেকে রাজিও হলেন না, এই অবস্থায় মুয়াবিয়া রা মারা গেলেন। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় আগের সরকার বলে গেলেই রাষ্ট্রপ্রধান হয় না। রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যুর পরে যখন জনগণ মেনে নেয়, তখন সেটা রাষ্ট্রপ্রধান বলে গণ্য হয়। অধিকাংশ জনগণ এজিদের হাতে বায়াত করল। মক্কা শরীফ, মদিনা শরীফের লোকেরা অনেকে এজিদের বায়াত করলো না। কেউ কেউ করল। কুফার লোকেরা লক্ষ লোকে চিঠি লিখে পাঠালো। মদিনায় ইমাম হোসাইন রা: ছিলেন। চিঠি লিখে পাঠালো। আপনি আসেন আপনাকে আমরা বাদশা বানাব। মুয়াবিয়া রা: মারা গিয়েছেন। এখন খলিফার পথ শূন্য। আপনাকে আমরা খলিফা বানাবো। আর কোন খলিফা মানবো না। তিনি মদিনার বন্ধুদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। সবাই বললেন যাবেন না। কুফার লোকেরা খুবই দুর্বল প্রকৃতির, আমাদের বাংলাদেশীদের মত বিরাট নারায়ে তাকবীর দিয়ে আমার পিছনে আসবে লক্ষ লক্ষ। ওদিক থেকে একবার সাউন্ড হয়েছে দেখবেন কিচ্ছু নেই। আর সিরিয়ার লোকেরা অসম্ভব যেদি তারা ময়দান ছাড়বে না। কুফার লোকেরা আপনার বাবাকে জ্বালাইছে। তারা তাদের প্রতিজ্ঞা রাখেনি। ভক্তি আছে, মহব্বত আছে কিন্তু কাজের সময় এলোমেলো হয়ে যায়। আপনি ওদের কাছে যেয়েন না। আপনি মদিনায় শান্তিতে থাকেন। রাষ্ট্র আপনার দরকার নেই। এক পর্যায়ে উনি বললেন যে না আমি ভয়ে বসে থাকব? সুন্নত কায়েমের জন্য, শরিয়া কায়েমের জন্য, হক কায়েমের জন্য আমি যাবো না। তারা চাচ্ছে আমি তো চাচ্ছি না। তখন উনি পরিবারের সদস্য নিয়ে মক্কা হয়ে কুফায় রওনা দিলেন। উনি যুদ্ধ করতে যাননি। উনি গিয়েছেন কুফাবাসী বায়াত করেছে। উনি তাদের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য গিয়েছেন। এজন্য পরিবারের সদস্য নিয়ে গেছেন, কোন সৈন্য নিয়ে যাননি। এজিদ খবর পেয়েছে। কুফার লোকেরা হোসাইন রা: র সাথে যোগাযোগ করছে। এজিদ তাড়াতাড়ি ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদকে পাঠিয়েছে দ্রুত যেয়ে কুফা থেকে নোমানকে সরাও, তুমি দায়িত্ব গ্রহণ করো। কুফাবাসীদের এমন সাইজ করবা যেন আর হোসাইন নামও মুখে নাই। আর হুসাইন যেন কুফায় ঢুকতে না পারে। আগেই তাকে বেরিকেড দিবা। দিয়ে ব্যাক করিয়ে দিবা। যাই হোক ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কুফায় আসার পরে কয়েকদিনের ভিতরে সব সাইজ। কুফাবাসীর আর কোন জিন্দাবাদ নেই। এখন আর কেউ হোসাইনের পক্ষে নেই। এখন বাহিনী নিয়ে কারবালার প্রান্তলে হোসাইনকে ঘেরাও করলেন। ওবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের বাহিনী। হোসাইন রা: বললেন যে আমি তো লড়তে আসিনির। তোমরা ডেকেছো তাই আসছি। তোমরা যদি তোমাদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করো তাহলে ছেড়ে দাও, আমি মক্কা চলে যাচ্ছি অথবা আমাকে ছেড়ে দাও। আমি বর্ডারে যেয়ে জিহাদ করব অথবা আমি এজিদের কাছে যেতে রাজি আছি। তোমাদের হাতে সারেন্ডার করতে রাজি নই। তো যাই হোক ওরা চিন্তা করলো, যে হুসাইনকে যদি আমরা না মারি তাহলে তো এজিদ খুশি হবে না। এক পর্যায়ে তারা হোসাইন রাদি বংশের নিষ্পাপ শিশু নিরীহ নারী পুরুষ সহ অনেক মানুষকে হত্যা করল। হোসাইন রাদি হত্যা করল এবং তার মাথা কেটে নিয়ে এজিদের কাছে পাঠালো। এক্ষেত্রে শুধু আপনাদের বলব বিষাদ সিন্ধুতে যে গল্প আছে সবই মিথ্যা। এগুলো কাল্পনিক উপন্যাস আমরা সত্য মনে করি। এজিদ বাহ্যত খুশিই হল। যদিও এজিদ হোসাইনকে হত্যা করার নির্দেশ দেইনি। তবে যারা হত্যা করেছে তাদের শাস্তি দেননি। বাহ্যত মনে হয়, সে খুশিই হল যে দুশমন একটা গেল। এজিদ আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের মতই খুবই পাকা ঈমানদার মুসলমান ছিলেন। নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, হজ করতেন। অবশ্য শিয়ারা বলে মত খাইতো এগুলো প্রমাণ পাওয়া যায় না। কারণ আমাদের দেশে আমরা ভালো মুসলমান, না সেই যুগের লোকেরা ভালো মুসলমান ছিল। আমাদের দেশের একজন সবচেয়ে বড় নাস্তিক মন্ত্রী, সে কি মানুষের সামনে মদ খাবে। মাতাল অবস্থায় বাইরে আসবে, ওযু না থাকলেও নামাজের ওয়াক্ত পড়ে গেলে ঠিক না। আপনারা কি মনে করেন সেই দেশের মানুষ এইটুক বুঝতো না। বিষয় হলো ঠিক আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের মতই বা বর্তমান বিশ্বের বা পরবর্তী বিশ্বের পূর্ববর্তী বিশ্বের বড় বড় রাজনীতিবিদ খলিফা আমির ওমরা বাদশা শাসক প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর মতই পাকা ঈমানদার ছিল। নামাজ রোজা হুজুরদের সম্মান সবই করতো। তবে ক্ষমতার কেউ প্রতিদ্বন্দী কোন মায়া দয়া নেই। এইজন্য ক্ষমতার জন্য এজিদ কয়েকটা কাজ করছিলেন। এক নম্বর হলো হোসাইনের খুন। শুধু হুসাইন নয় তার বংশের নিরীহ মানুষদের এই যে খুন করা হল এটা উনি বিচার করেননি। সবচেয়ে পজিটিভ এটুকু বলা যায় তিনি হুকুম দেননি। কিন্তু তিনি কোন বিচার করেননি, দুঃখ প্রকাশ করেননি, শাস্তি দেননি বরং এরাই তার মূল বাহিনী ছিল। দ্বিতীয় হোসাইন গেলেন। পরের বছরে মদিনার লোকেরা বিদ্রোহ করলো। সৈন্য পাঠালো এজিদ। মদিনায় শত শত হাজার গণহত্যা সাহাবীদেরকে হত্যা করে, সাহাবীদের আওলাদদের হত্যা করে, ধর্ষণ হয়েছে, এজিদের বাহিনী মদিনায় গণহত্যা চালাইছে। এজিদের দুই বছরের দুই কাজ। তৃতীয় বছরে মক্কায় বাহিনী পাঠালো মক্কায় কাবা ঘরে কামান দেখলো। তৃতীয় কাজ এই সবকিছু কেন করল, ক্ষমতায় থাকার জন্য। মজা হলো চতুর্থ বছরে এজিদ মারা যায়। চতুর্থ বছরে এজিদ মারা যায়। বিষাদ সিন্ধুতে যা আছে মিছে কথা। স্বাভাবিক অসুখ এসে এজিদ মারা যায়। এর চেয়েও মজা হলো দুনিয়াতে যত রাজা বাদশা মরে গেছে প্রত্যেকের বংশের কেউ না কেউ রাজা হয়েছে। এদের বংশে আজ পর্যন্ত কেউ রাজা হয়নি। আজ পর্যন্ত এজিদের মৃত্যুর পরে তার ছেলে মুয়াবিয়া ইবনে এজিদ ইবনে মুয়াবিয়া রাজত্ব নিছিলেন। বলা হয় খুব ভালো মানুষ ছিলেন। ওই উমাইয়ারা ওকে মেরে ফেলে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত এজিদের বংশের কেউ রাজা হয়নি। অন্যান্য অনেক বংশের হয়েছে। শয়তানের বংশ, ভালো মানুষের বংশ। তাহলে এখানে বড় শিক্ষা আমরা দেখছি যে, ক্ষমতার জন্য আমরা এত কিছু করলাম সেই ক্ষমতা না এজিদ নিজে ভোগ করলো না তার বংশের কেউ ভোগ করতে পারল। এর ভিতরে আমাদের অনেক শিক্ষা আছে ভাইয়েরা আল্লাহর এই বিচার কিন্তু চিরন্তন। আপনি মানুষের উপরে জুলুম করছেন, জমি কেড়ে নিচ্ছেন, মিথ্যা সাক্ষী দিচ্ছেন খুন করছেন, হয়তোবা সমাজের মাদবরির অথবা কিছু জমি জমা টাকা পয়সার জন্য অথবা রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য। কিন্তু আপনি কি করছেন? আপনি কয়দিনেই ক্ষমতা ভোগ করবেন? হতে পারে আপনার পরে আপনার বংশের কেউই আর এই ক্ষমতা ভোগ করবে না। এই জমিতে আর তারা থাকতে পারবে না। এরকম আমাদের চোখের সামনে আশেপাশে তাকালে দেখবেন একজন লোক বিশাল বড় লোক ছিল। দ্বিতীয় পুরুষে জমিতো জমি গোরস্থান পর্যন্ত বেছে ফেলেছে। বাপের কবর পর্যন্ত বেছে ফেলেছে। কাজেই আমরা যারা আল্লাহর দ্বীনের বাইরে মানুষের উপর জুলুম করে টাকা বলেন, ক্ষমতা বলেন, শক্তি বলেন, সম্পদ বলেন, যোগাড় করতে চায় তাদের বুঝতে হবে, যে সবকিছু আপনার প্লানে হবে না। এজিদ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর বংশের। তার পিতা মুয়াবিয়া রাদি 20 বছর একেবারে শক্তির সাথে শাসন করেছেন। তারই ছেলে সে চারটে বছরও বাঁচতে পারলো না। মরে গেল। এই যে মানুষ মেরে ক্ষমতায় থাকলো এই ক্ষমতা সে ভোগ করতে পারলো না। হোসাইন রাদিয়াল্লাহু পরিবার, মদিনার সাহাবীদের পরিবার, মক্কায় কামান দেখলো এত কিছু করল কি জন্য? একটা গোল যে ক্ষমতাটা সুসংহত করবে। কিন্তু হলো না আরো মজার ব্যাপার যেটা, সাধারণত ঘটে না তার বংশের কেউ আর ক্ষমতায় থাকতে পারল না। দ্বিতীয় বিষয় হলো ইমাম হোসাইনের শাহাদত, ইমাম হোসাইন যখন মক্কা থেকে চলে আসবেন মদিনা থেকে মক্কা মক্কা থেকে কুফা যাবে তখন দুই একজন প্রবীণ সাহাবী বলছিলেন যে দেখেন আপনার নানা হলেন আখেরাতের বাদশা। দুনিয়ার বাদশাহী আপনাদের জন্য পোষাবে না। কাজেই ওদের দিকে যেয়ে দুনিয়ার বাদশাহী তারা চাননি। তারা দ্বীনের জন্যই গিছিলেন। তবে আমাদের বুঝতে হবে দুনিয়ার সাময়িক পরাজয় কিন্তু পরাজয় না। ইমাম হোসাইন মারা গিয়েছেন। নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছে। কিন্তু বীরের মত লড়ে মরেছেন। তিনি মৃত্যুকে ভয় পাননি। আমরা বাহ্যিকভাবে দেখি যে তার মৃত্যুতে এজিদের বাহিনী ভয়ঙ্কর খুশি হয়েছে গেছে, শেষ আমরা জিতে গেছি। কিন্তু আসলে কি আছে আছে নেই, নেই তো নেই। কারবালার হত্যাকাণ্ডে যারা শরিক হয়েছে প্রত্যেকেই খুন হয়েছে একজনও বাচেনি। এবং সবচেয়ে বড় কথা যে আমরা যেটাকে সাময়িক পরাজয় মনে করি, আচ্ছা ইমাম হোসাইন কি পরাজিত হয়ে গেছেন, ইতিহাস থেকে মুছে গেছে তার বংশধর মুছে গেছে, তার মর্যাদা কি কমে গেছে কিছুই? যায় নি। আমরা কোন নেককার মানুষ কোন ভালো মানুষ দুনিয়ায় হয়তো মরে গেছেন, হেরে গেছেন, মামলায় ঠকে গেছেন। মানুষে তাকে মাথায় বাড়ি দিয়ে মেরে ফেলেছে। কোন খারাপ লোকে মরে গেছেন, এক্সিডেন্ট হয়ে মরে গেছেন। লোকটা ভালো ছিল না। খবরদার। মানুষের দুনিয়ার পরিণতি দিয়ে, আখেরাতের পরিণতি বিচার করলে তো বলতে হবে যে এজিদ ভালো ছিল। নাউজুবিল্লাহ ইমাম হোসাইন হেরে গেছেন। এরকম বলার সুযোগ আছে নাকি? ওই সময়র ওই এক দুই বছর তিন বছর যাদের ঈমান দুর্বল তারা এরকম চিন্তা করেছে। তাই তো হোসাইন হেরে গেল মদিনাবাসী হেরে গেল মক্কাবাসী হেরে গেল। তহলে এজিদ বোধয় ঠিক। ওই তিন চার বছর কারা চিন্তা করেছে? যাদের ঈমান মজবুত হয়নি।